*অপারেটর সংকটে সরকারের গলার কাঁটা এসপিএম প্রকল্প
*আসছে ঋণের কিস্তি, নেই কোনো সুফল
*অপারেটর ছাড়াই হস্তান্তর, ঝুঁকি বাড়ছে
*বিপজ্জনক অবস্থায় বিপুল পরিমাণ তেল
*শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগ
সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহণের উচ্চাকাক্সক্ষী প্রকল্প এখন সরকারের জন্য মারাত্মক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে চলে যাচ্ছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপি)। ওই তারিখের পর প্রকল্পে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে দায় নেবে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এত বড় ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প বুঝে নেওয়ার মতো দক্ষ জনবল কিংবা অপারেটর কোনোটিই এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি হস্তান্তরের মুহূর্তে সরকার কার্যত এক ধরনের অন্ধকারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কারণ, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি, যারা এই জটিল পাইপলাইন পরিচালনার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ও সক্ষম।
বিপিসি সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত সিপিপি, মালয়েশিয়ার পার্টামিনা রিফাইনারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের কাগজ কিনেছে। তবে কেউই এখনো দরপত্র জমা দেয়নি। এর আগে গত বছর প্রথম দফা দরপত্রে সিপিপি অযোগ্য ঘোষিত হয় এবং পার্টামিনার অস্বাভাবিক চার্জের কারণে সরকার পুরো টেন্ডার বাতিল করতে বাধ্য হয়। প্রকল্পটির আওতায় বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। কিন্তু অপারেটর সংকট ও ত্রুটির কারণে আজ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যায়নি। এই দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটি কেবল সরকারের জন্য ব্যয়ের খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পাইপলাইন ও ২ লাখ টন ধারণক্ষমতার স্টোরেজ ট্যাংক রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এখন পর্যন্ত শুধু রক্ষণাবেক্ষণেই সরকারের খরচ হয়েছে ১৩০ কোটি টাকার বেশি।
পিটিসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, কোনো আউটপুট না থাকলেও ২০ জন চীনা কর্মী, ৫০ জন স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, ফায়ার সার্ভিস, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ৩৫টি জেনারেটর, টাগবোটসহ নানা যন্ত্রপাতির পেছনে মাসে ৪৫ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।
উদ্বেগ আরও বেড়েছে প্রকল্প এলাকায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুদ থাকায়। বিপিসি সূত্র জানায়, স্টোরেজ ট্যাংকে প্রায় ৩৯ হাজার টন তেল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি পাইপলাইনের ভেতরেও রয়েছে প্রায় ২০ হাজার টন তেল। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রথম পরীক্ষায় পাইপলাইনে মারাত্মক ত্রুটি ধরা পড়ে এবং এক পর্যায়ে পাইপলাইন ফেটে যায়। নিরাপত্তা জোরদারের জন্য ২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফা পরীক্ষা চালানো হলেও অভিযোগের শেষ নেই।
বিপিসির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএলএফ ইতোমধ্যে সিপিপিকে একাধিক ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে। তবে ৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে তথাকথিত ডিফেকটিভ লায়াবেলিটি পিরিয়ড। এরপর কোনো সমস্যা দেখা দিলে দায় নেবে না চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কর্মকর্তারা জানান, এই সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়াতে চাইলে সিপিপি মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে, যা সরকার দিতে রাজি হয়নি। নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বলছে, প্রকল্পের নকশা ও চুক্তিতেই বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের জটিল প্রকল্পে ঠিকাদারকে ৩–৫ বছর অপারেশনের দায়িত্বে রাখা হয়। কিন্তু এখানে সে শর্ত রাখা হয়নি। শুধু নির্মাণ কাজ করেই দায়মুক্তির সুযোগ পেয়েছে সিপিপি। কেউ কেউ মনে করছেন, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতেই ইচ্ছাকৃতভাবে এই শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছিল। ফলে পুরো প্রকল্পটি তদন্তের আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো প্রকল্পটি এখনো কার্যকর না হলেও দুই বছর পর চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হবে। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে চীন থেকে, সরকারের সার্বভৌম নিশ্চয়তায়। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প আজও সুফল দিতে ব্যর্থ। বরং সমুদ্রের তলদেশে স্থাপিত এই পাইপলাইন এখন সরকারের জন্য এক ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (পরিকল্পনা) ড. আজাদুর রহমান জানান, সিপিপিকে প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অপারেশন ও দায়দায়িত্বে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উল্টো তারা কঠিন শর্ত আরোপ করে, যা সরকারের পক্ষে মানা সম্ভব হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকল্প বুঝে নিতে হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এসপিএম প্রকল্প পরিচালনার জন্য দ্বিতীয় দফা দরপত্র প্রক্রিয়া এখনো চলমান। টেন্ডার জমার শেষ তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি, অথচ তার ১০ দিন আগেই চীনা কোম্পানি প্রকল্প হস্তান্তর করে বিদায় নেবে। অর্থাৎ অপারেটর ছাড়াই প্রকল্প সরকারের ঘাড়ে এসে পড়ছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এত বড় একটি প্রকল্প আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সবকিছু ঠিক আছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
সমুদ্রের তলদেশে ঝুঁকিতে জ্বালানি তেল পরিবহন প্রকল্প
- আপলোড সময় : ২০-০১-২০২৬ ১০:৫৯:৩০ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২০-০১-২০২৬ ১০:৫৯:৩০ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
জাহাঙ্গীর খান বাবু